সোমবার ১ জুন ২০২৬ , (১১:৪৫ PM) / ১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আপরাধ

ফাঁদ পেতে ও প্রভাব খাটিয়ে একাধিক মেয়ের ইজ্জত লুটানো যার নেশা

স্টাফ রিপোর্টার   লক্ষ্মীপুর

১২ আগস্ট ২০২৫


ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক হোটেল রেষ্টুরেন্ট ও বিভিন্ন বাসা-বাড়ীতে ডেকে নিয়ে মেয়েদের চরিত্র হননের চেষ্টায় আমজাদ।
ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক হোটেল রেষ্টুরেন্ট ও বিভিন্ন বাসা-বাড়ীতে ডেকে নিয়ে মেয়েদের চরিত্র হননের চেষ্টায় আমজাদ। | ছবি: নয়া চাঁদ

আমজাদ হোসেন সাগর। বিভিন্ন ফাঁদ পেতে একাধিক মেয়ের সাথে অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়েছে। বল প্রয়োগ ও প্রভাব খাটিয়ে একাধিক মেয়ের ইজ্জত লুটিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমন অসংখ্য ভিডিও ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে যে ছেলেটিকে দেখা যায় সে অভিযুক্ত আমজাদ বলে নিশ্চিত করেছেন প্রতিবেদক ও তার সহপাঠিসহ একাধিক সোর্স। এমন ভাইরাল হওয়া অসংখ্য ভিডি ক্লিপের কিছু ক্লিপ ও ছবি এই প্রতিবেদকের নিকট সংগ্রহীত রয়েছে।

ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েদের অভিযোগের অডিও বক্তব্যও রয়েছে এই প্রতিবেদকের নিকট। ভুক্তভোগী মেয়েদের সামাজিকতা মান-সম্মান বিবেচনায় তাদের নাম ঠিকানা প্রকাশের অনিচ্ছা প্রকাশ করছে প্রতিবেদক। তবে তাদের কাল্পনিক বা ছদ্মনাম ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিতে দেখা যায়- কোন এক বাসা বাড়ীর নিদিষ্ট একটি রুমে আমজাদ একটি জন্মনিয়ন্ত্রণ ডটেট (কনডমের) প্যাকেট হাতে নিয়ে নাড়া ছাড়া করছে। আর দুটি মেয়ে খাটে বসে আছে। নিজেই মোবাইলে দিয়ে করা ভিডিওতে দুইটি মেয়েকে উদ্দেশ্যে করে তাকে বলতে শুনা যাচ্ছে যে, একটা কালকে শেষ।

অর্থাৎ গতকাল একটা ব্যবহার করেছে, সেটি হয়তো অন্য কারো সাথে! গোপন ক্যামরায় ধারণ করা আরেকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে জোরপূর্বক একটি মেয়ের সাথে অনৈতিক কাজে লিপ্ত আমজাদ। প্রথমে চেয়ারে বসে পরে একাধিকভাবে মেয়েটির ইজ্জত লুটে নিচ্ছে আমজাদ। সেখানে দেখা যাচ্ছে মেয়েটি এমন অনৈতিক কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখাতে চেষ্টা করছে আর আমজাদ জোর প্রয়োগ করছে। তবে স্থানটি কোথায় তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে শহরের কোন একটি রেষ্টুরেন্টে হবে। এছাড়া প্রতিবেদকের হাতে আসা ০৭ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের আরও একটি ইমু ভিডিতে দেখা যায় একটি মেয়ের সাথে ইমু এ্যাপের মাধ্যমে হেডফোন লাগিয়ে কথোপকথন হচ্ছে। ভিডিওতে দুজনের মুখের অঙ্গভঙ্গিতে দেখা যায় খুব গভীরে চলে গিয়ে পরস্পর ইম্যাজিনের মাধ্যমে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। তবে সাড়ে সাত মিনিটের ভিডিওর মাঝখানে টানা এক মিনিট ভিডিওতে আমজাদ তার বিশেষ অঙ্গ প্রদর্শন করতেও দেখা গেছে। 
প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক দিনের একাধিক মেয়ের একাধিক ছবি সংগ্রহকৃত আছে। ভিডিও

পাশপাশি একটি ছবিতে দেখা যায়, আমজাদ উলঙ্গ অবস্থায় টয়লেটের ভিতর ছবি তুলছে। সেটি স্বচ্ছ আয়নার প্রতিচ্ছবি ছিল। টয়লেটের ভিতর একটি মেয়ের অবস্থানও দেখা গেছে সেখানে। আমজাদের সেল্পি তোলা আরেক ছবিতে দেখা যায় একটি মেয়ের সাথে নাকে নাক বাজিয়ে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায় একটি মেয়ের কাধের উপর হাতে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে আছে। অন্য ছবিতে দেখা যায় সেল্পি তুলছে আর একটি মেয়ে তার কাধে হাত রেখে বসে আছে। তবে সেল্পির একই ফ্রেমে পাশের সিটে আমজাদের কোন এক বন্ধুর কোলে আরেকটি মেয়েকেও দেখা গেছে। তারা আমজাদের বন্ধু মহল হলেও তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হাতে আসা দুই এঙ্গেলের আরও দুটি ছবিতে দেখা যায় রঙ্গরস করে আমজাদ সেল্পি তুলছে একটি মেয়ে সঙ্গে। এসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় আলোচনা-সমালোচনা ঝড় উঠেছে লক্ষ্মীপুরে। টক অব দ্যা টাউনে পরিনত হয়েছে।

তবে তার এমন অনৈতিক কার্যক্রমের দায়ভার নিতে চায়না কেউ। যদিও নিজেকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে শুরু করে সর্বস্থানে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে বেড়ায় আমজাদ। প্রতিবেদকের নিটক ছাড়াও আরো অসংখ্য ছবি ভিডিও বিভিন্ন নেটিজেনদার নিকট রয়েছে বলে জানান একাধিক সোর্স।

আমজাদের এমন ছবি ও ভাইরাল হলেও এটা মামুলি বেপার ও তার নিকট তুচ্ছ। এখনো শহরের বিভিন্ন আনাছে-কানাছে এবং বিভিন্ন দপ্তরে দেখা যায় তাকে। বুক ফুলিয়ে এখনো চলাফেরা করছে সে। এসব ভিডিও কিভাবে ভাইরাল হয়েছে তা খতিয়ে দেখে অন্যের ক্ষতি করবে বলেও হুমকি দেয় আমজাদ। প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া তাকে কেউ দমাতে পারবেনা বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

জানাগেছে, বিগত ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমজাদের সম্পৃক্ততা ছিল। পরবর্তীতে বন্যা কবলিত এলাকায় সেনাবাহিনী থেকে পাওয়া ত্রাণ বিভিন্ন স্থানে বিতরণের কাজ করেছে সে। সেই সুযোগ নিয়ে মেয়েদেরকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ভয় দেখিয়ে সর্বনাশের পথ সুগম করে নেয়।
আমজাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নিজেকে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন স্থানে মিটিং আছে কিংবা সভা আছে বলে  মেয়েদেরকে ডেকে আনতো। এরপর তাকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজ করার চেষ্টা করতো। আবার কাউকে কাউকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে যৌন হয়রানী করতো। তখন ছবি তুলে মেয়েদের ব্লেকমেইল করতো। এভাবে তার সাথে সহবাসের জন্য মেয়েদের বাধ্য করতো।

এমনি অভিযোগকারী নাম না প্রকাশে ভুক্তভোগী খুশবো (ছদ্মনাম) অডিও রেকর্ডে সব শিকার করেছেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন ভাবে আমজাদের সাথে পরিচয় হয় কথা হয়। মাঝে মধ্যে ম্যাসেজ দিতো, প্রায় প্লাটিং করতো অর্থাৎ ইভটিজিং করতো। আমি মাইন্ড করলে উনি মজা করছে বলে উড়িয়ে দিতো। একদিন আমাকে সমন্বয়কের মিটিংয়ের কথা বলে রেষ্টুরেন্টে আসতে বলেছে। আমি তখন স্পটে গিয়ে দেখি উনি ছাড়া কেউ নাই। তখন আমি বাকীদের কথা জিজ্ঞেস করি তখন আমজাদ বলে অপেক্ষা করো সবাই আসবে। অথচ কেউ আসেনা। তখন উনি (আমজাদ) আমার পাশে এসে বলে আমি তার সাথে পার্সনাল টাইম কাটাইতাম। এই নিয়ে আমি উনাকে বলি আমি সবার কাছে বলে দিবো। তখন উনি আমাকে থ্রেট দেয়, খারাপ ভাষায় কথা বলে। আমি নাকি উনাকে কিছু করতে পারবোনা। উনি অনেক বড় সমন্বয়ক এবং উনার সাথে আর্মি পুলিশ সবার সাথে ভালো কানেকশান আছে। এটাও বলে আমি যদি এসব কারো কাছে বলি তাহলে উনি আমার নামে উল্টাপাল্টা কথা বলে আমার সম্মানহানি করবে। আমি আমার কিছু বন্ধুদের জানাই, ওরাও আমাকে বলে আমজাদ আমার ক্ষতি করে দিবে। যার কারনে আমি আমার সম্মানের কথা ভেবে মেয়ে হিসেবে চুপ ছিলাম। কিন্তু উনার কার্যক্রম দেখে আমি এগুলো প্রকাশ্যে আনলাম।

অন্য আরেকটা মেয়ে খুশি (ছদ্মানাম) অভিযোগ করে বলেন, আমার একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল। আমার বিএফ এর মাধ্যমে আমজাদের সাথে দেখছি। আমার বিএফের সঙ্গে আমার একটু দুরত্ব ছিল। আমার দূরত্বের সুযোগ নিয়ে এই সুযোগে সে আমার কাছে এসে বলে আমি তার সাথে সম্পর্ক যাইতে পারি। কেউ কিছু যানবেনা। আমার উপর সব কিছু নির্ভর করছে আমি কি চাইতেছি। তখন আমি তাকে বলছি যে, আমি আপনার বন্ধুকে সব বলে দিবো। প্রুফ সহ দিয়ে দিবো। তখন সে আমাকে থ্রেট দিয়ে বলে আমার নাকি সে ক্ষতি করবে। কি ক্ষতি করবে? ও আমাকে বলতেছিল আমার বন্ধুর সাথে সামান্য কিছু পারর্সনাল ছবি আছে, তার কাছে নাকি আছে সে গুলো ভাইরাল করে দিবে। আমাকে থ্রেট দিতেছিল। তারপর আমি তাকে বুজাইছ। সে (আমজাদ) আমার কাছে থেকে ৩০ হাজার টাকা দাবি করছে। সেকেন্ড একটা শর্ত দিছে আমারে। ওর সাথে ঘুরতে যাইতে হবে, দুই তিন দিরেন একটা ট্যুর দিতে হবে কাউকে বলা যাবেনা। আমি তার অনেক কথা বলছি এবং তাকে ব্লক মেরে দিছি। সে আসলে খুবই জগন্য এটা মানুষের জানা উচিত বলে মনে করে এই ভুক্তভোগী। তার শাস্তির দাবি করে ভুক্তভোগী খুশি। পরবর্তীতে অভিযোগকারী দুইজনই এই প্রতিবেদকের নিকট ভিডিও বক্তব্য দেন। সেখানেও একই অভিযোগ তাদের। 

এভাবে অসংখ্য অভিযোগে অভিযুক্ত আমজাদ। শুধু নারী কেলেংকারী-ই নয়, সমন্বয়ক পরিচয়ে বিভিন্ন স্থানে মানুষকে হয়রানী, চাঁদা দাবি করে বেড়ায় সে। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তর দেখা যায় তাকে। সমাজে এমন কোন কাজ নাই সে করেনি।
অভিযুক্ত আমজাদ নিজেকে কখনো সমন্বয়ক পরিচয়, কখনো জুলাই মঞ্চের সদস্য, কখনো পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনীর খুব কাছের লোক বলে পরিচয় দেয়, আবার কখনো কখনো সমাজসেবক হিসেবেও পরিচয় দিয়ে বেড়ায়। আমজাদ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ৫ নং পার্ববর্তীনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা।

জানতে চাইলে জুলাই মঞ্চ জেলা সদস্য সচিব মো. বেলাল হোসেন হৃদয় বলেছেন, আমজাদ জুলাই মঞ্চের যুগ্ম মুখ্য প্রতিনিধি ছিল। তার বিষয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় যে ছবি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে আমরা বিষয়টি অবগত হইছি। তাৎক্ষনিক জরুরী বৈঠকের মাধ্যমে প্রাথমিক তার পদ স্থগিত হয়েছে। আমরা তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন  করেছি। তারা আগামী সাত কার্যদিবসে মধ্যে সত্য উদঘাটন করে রিপোর্ট দিবে। সত্যতা পেলে সাগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে পাশাপাশি ভুক্তভোগী কেউ আমাদের নিকট অভিযোগ করলে তাদেরকে আইনীভাবে সহায়তা করা হবে। 

আমজাদের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক জেলা সমন্বয়ক আরমান হোসেন বলেছেন, আমজাদ কখনো জুলাই আন্দোলনে ছিলনা, সে সমন্বয়ক কমিটির কোন সদস্যও না। মূলত আন্দোলনের পর বন্যাকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর সাথে সঙ্গ দিয়ে কিছু ত্রাণ বিতরণ কাজে ছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য। তবে আমরা ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্ত কোন ছাত্রী যদি আাইনের আশ্রয় নিতে চায় আমরা সেই বোনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ফোন করা হয় আমজাদকে। প্রথমে কেটে দিলেও পরবর্তীতে ফোন রিসিভি করে আমজাদ। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটা এ আই সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি করা। ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিও তার নয় এবং কোন চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয় বলেও দাবি তার। ভুক্তভোগীদের অভিযোগও মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয় আমজাদ। তাছাড়া আমজাদ বলেন জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি সালাহ উদ্দিন টিপু তাকে ফোন করে হুমকি দিয়েছে। তারাও করতে পারে বলে দাবি তার। তবে তার দাবি অনুযায়ী যারা তাকে নিয়ে এমন ভিডিও ছবি বানিয়েছে তাদের কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেছে কিনা। এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন থানায় জিডি করেছেন এবং সাইবার ক্রাইমে মামলাও করেছেন। তার দায়ের করা এসব অভিযোগের ডুকুমেন্ট সরবরাহ করার কথা থাকলেও প্রতিবেদককে সরবরাহ করেনি আমজাদ। একপর্যায়ে লাইন কেটে যায়।  

এমন ঘটনার অভিযোগ তদন্ত করে প্রমানিত হলে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন লক্ষ্মীপুর সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ রাহাত খান।