২০২৪ এর ৪ঠা আগস্ট সকাল নয় টায় বাসা থেকে বের হয়ে সংবাদ সংগ্রহের লক্ষ্যে লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে প্রথমে অপেক্ষমান থাকি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের কোটা বিরোধী আন্দোলন, তথা জুলাই আন্দোলনে রুপ নেয়া আন্দোলন চলমান।
তারই ধারাবাহিকতায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত আছে। বিগত দিনের মতোই ৪ঠা আগষ্ট নিদিষ্ট কর্মসূচি দিয়েছে তারা। একইসঙ্গে আওয়ামীলীগ যুবলীগ ও ছাত্রলীগেরও কর্মসূচি আছে শহরের উত্তর স্টেশন(এখন আফনান চত্ত্বর হিসেবে পরিচিতি এলাকায়) উভয়ের ঘোষিত কর্মসূচির সংবাদ কাভারেজ করতে বের হয়ে গেলাম। আদর্শ সামাদ থেকে বাইকযোগে লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে পরিস্থিতি অবলকন করছি।
পথিমধ্যে দেখা হয় সহকর্মী অনুজ আমারদেশ জেলা প্রতিনিধি রাজিব হোসেন রাজুর সঙ্গে। যখন বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লোকজন বাগবাড়ীতে জড়ো হবে সেখান থেকে মিছিল নিয়ে ঝুমুরে অবস্থান করবে। তখন তাকেও (রাজুকে) বলি চলো বাগবাড়ীতে কোন একটা কিছু হচ্ছে বা হবে। যদিও তার অন্য আরেকটা সংবাদ কাভারেজ করতে হবে বলে আমার সাথে আর যায়নি। এসময় উত্তর তেমুহনী মোজাম্মেল হক ফিলিং স্টেশন (পেট্রল পাম্পের) সামনে বেশ কয়েকজন আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা লাল চেয়ার বিছিয়ে বসে তাদের অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। সেখান থেকে কিছু ভিডিও ফুটেজ নিয়ে বাগবাড়ী করিম টাওয়ারের সামনে অবস্থান নিয়ে দেখলাম বেশ কয়েকজন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মী অবস্থান করছে। সময় তখন সাড়ে নয়টা। সেখানে তাদের হাতে লাঠি-সোটা ও লোহার রড নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে (তাদের ভাষায়) নাশকতা প্রতিরোধ করতে।
প্রথমে ভাবছি তারা বুঝি ছাত্র আন্দোলনের লোকজন। পরে বেশি সংখ্যক লোক চিনতে পেরে নিশ্চিত হলাম তারা ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মী। পূর্বপরিকল্পিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে যখন শিক্ষার্থীরা বাগবাড়ীতে বিভিন্ন দিক থেকে আস্তে আস্তে জড়ো হচ্ছে। স্থানীয় কালী বাজার থেকে সিএনজি যোগে, মান্দারী-জকসিন কিংবা ঝুমুর এলাকা থেকে সিএনজি যোগে এবং ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের সামনে দিয়ে দক্ষিণ তেমুহনী হতে অটো সিএনজি যোগে ছাত্ররা এসে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে। তবে সে সুযোগ দিচ্ছেনা ছাত্রলীগ যুবলীগ। একটু অপেক্ষা করতেই আন্দোলন করতে আসা ছাত্রদের মারধর শুরু করছে তারা। যাকেই পাচ্ছে তাকেই লাঠি সোটা দিয়ে মারধর করছে, লাথি-ঘুষি দিয়ে পুনরায় সিএনজিতে তুলে দেয় ফিরে যেতে বাধ্য করছে। এভাবে চলতে থাকে প্রায় আধা ঘন্টা। দুইজন তিনজন করে অন্তত ৫০জন শিক্ষার্থী মারধরের শিকার হয় তখন। এভাবে ১০ টা পর্যন্ত চলে। যখন লোহার রড দিয়ে মারধর করে তখন মাঝেমধ্যে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করছি এবং ছাত্রলীগ যুবলীগের হাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করা চেষ্টা করছি। মারধর না করে বুজিয়ে বলে ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করছি ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীদের। তখন শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেও একটু আঘাত প্রাপ্ত হই। এসময় সাংবাদিক ইউছুফ সহ আরো একাধিক গনামধ্যম কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
সে সময় লক্ষ্মীপুর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের ক্যামরা সহ আশপাশের সব গুলো সিসি ক্যামরা ভেঙ্গে ফেলে ছাত্রলীগ যুবলীগ। স্কুলটির সামনে জড়ো হয়ে ভাঙচুরও করে তারা। ছাত্রলীগের ধাওয়ায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী সম্ভবত স্কুলে ঢুকে পড়ে। ছাত্রলীগ বহু চেষ্টা করছে তাদের বের করতে কিন্তু পারেনি। আমি সহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম কর্মী এসব চিত্র দেখে যাচ্ছি আর ছবি তুলছি। তখন সংবাদ কাভারেজ করতে গিয়ে এটিএন নিউজের মেহেরাব হোসেন রবিন হুমকির শিকার হন। এরিমধ্যে হয়তো শিক্ষার্থীদের সহ-পাঠিরা খবর পেয়ে গেছে যে, বাগবাড়ীতে শিক্ষার্থীদের মারধর করা হচ্ছে। প্রায় অধাঘন্টার মধ্যে উত্তর তেমুহনী থেকে আসতে থাকে কিছু শিক্ষার্থী। “নারেয়ে তাকবির, আল্লাহ আকবার” স্লোগান দিয়ে অন্তত দেড়শ শিক্ষার্থী মুর্হুতেই একইস্থানে উপস্থিত হয়। সময় তখন সাড়ে ১০ টা। এরিমধ্যে ছাত্রলীগ-যুবলীগ দিব্দিক ছুটাছুটি করে পালিয়ে যায়। ভারী হতে থাকে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহন। বাগবাড়ীর করিম টাওয়ার ও ঐতিহ্য কনভেনশন সেন্টারের সামনের মহাসড়কের উপর জড়ো হয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এবং “কই গেলিরে শালারা আইছে তোদের বাবারা” তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার স্লোগান দিতে থাকে। পরবর্তীতে ১১ টার দিকে মিছিল নিয়ে ঝুমুর চত্ত্বর দিকে রওয়ান দেয় বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী সহ প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী। মাদাম পার হয়ে মিছিলটি যখন ঝুমুরে যাবে পথিমধ্যে সার্কিট হাউজের সামনে সদর থানা তৎকালীন (ওসি তদন্ত) পরবর্তীতে রায়পুর থানা অফিসার ইনচার্জ নিজাম উদ্দিনের নেতৃত্বে বহু সংখ্যক পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল। এসময় আমিও মিছিলের ছবি তুলতে তুলতে সামনে এগিয়ে গিয়ে পুলিশের সামনে হাত উঁছিয়ে দাঁড়িয়ে যাই। যেন বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল না মারতে পারে।কোন ক্ষতি না করতে পারে। তবে হাজার হাজার আন্দোলরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু ক্ষুব্দ ছাত্র-জনতা ইট-পাটকেল মারার চেষ্টা করে। যদিও আমি আমার হাতে থাকা মাছরাঙা টেলিভিশনের বুম নাড়িয়ে চলে যেতে বলি। সেখানেও দুই একটা ইটের আঘাত লেগে আমি একটু আহত হই। একপর্যায়ে আমার সাথে যোগ হয় নেতৃত্বদানকারী কিছু শিক্ষার্থীও হাতে হাত রেখে পুলিশকে প্রটোকল দেই। সবাই মিছিল নিয়ে ঝুমুরে ইলিশ চত্ত্বর তথা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনেই অবস্থান নিয়ে এক দফার দাবিতে টানা আন্দোলন চলতে থাকে।
সংবাদ কাভারেজ করতে গিয়ে সকালের নাস্তা এখনো করার সুযোগ হয়নি। প্রায় এক ঘন্টা পর প্রতিরোধের ভারী প্রস্তুতি নিয়ে আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ বিশাল মিছিল যোগে বাগবাড়ী হয়ে মাদাম ব্রিজের উপর দিয়ে ঝুমুরে দিকে আসতে থাকে। ঝুমুরে অবস্থানরত শিক্ষার্থী-জনতা প্রথমে ভাবছে তাদেরই সহকর্মী কিংবা তাদেরকে সহমর্মিতা জানিয়ে আন্দোলনকারীদের আরো কিছু অংশীজন এগিয়ে আসছে। এসময় স্বাগত জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ। যখন মাদাম ব্রিজ থেকে নেমে সার্কিট হাউস পার হয়ে জজকোর্টের পশ্চিম গেইটে চলে আসে, তখন শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারছে তারা আওয়ামীলগ-যুবলীগ ছাত্রলীগ। বিষয়টি তখনই তখন ছাত্রলীগ-যুবলীগের মিছিল থেকে দুই একটা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হলে শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যায় যে, তাদের প্রতিপক্ষ। মুহুর্তেই পাল্টে যায় পরিস্থিতি। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ প্রতিরোধ করতে সামনে এগিয়ে আসে আবার কেউ পিছিয়ে যাবার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবেলা করবে তখনও ভাবছে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা। তবে কিছু বুজে উঠার আগেই সংঘর্ষে রুপ নেয়। জয় বাংলার স্লোগান দিয়ে ধর ধর বলে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করলে মুহুর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও জনতার ভিড়। দিব্দিক ছুটাছুটি করে একজন এক এক দিকে পালিয়ে যায়। এসময় সামনে যাকে পাচ্ছে তাকেই লাঠিসোটা দিয়ে মারধর করছে প্রতিপক্ষের লোকজন। এরমধ্যে বেশ কয়েকজন হামলার শিকার হয়। আমার হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে আমি ফুটেজ নিচ্ছি।আমার উপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে সাংবাদিক বুজতে পেরে কিছু বলেনি। তখনো আওয়ামীলীগ যুবলীগ ছাত্রলীগের মিছিল পিছন থেকে সামনে আরো অগ্রসর হচ্ছে। এমবস্থায় মুহুর্তেই আবারো নারায়ে তাকবির স্লোগান দিয়ে ধর ধর বলে পাল্টা ধাওয়া দেয় ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী। একপর্যায়ে যোগ হয় সকল শিক্ষার্থী আন্দোলরত মানুষ তাদের সঙ্গে।চলতে থাকেদুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামীলীগকে সামনে থেকে পিছন থেকে ইউট্রান করে পালাতে থাকে। প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করতে করতে মাদাম ব্রিজ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ছুটে যায়। সেখানেই গুলিবিদ্ধ হয় শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত সাদ আল আফনান নামে লক্ষ্মীপুর ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী।
এদিকে ছাত্রলীগ যুবলীগের কেউ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে, কেউ আদালতের ভিতরে, কেউ সার্কিট হাউজের ভিতর ঢুকে পড়ে। তবে ঘটনাস্থলে আটকে যায় লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পিও। সে ছাত্র-জনতার রোষানলে পড়ে। একইসময় সিএনজিযোগে আসা চারজন কোর্ট পুলিশের সদস্য আহত হয়। আমি নিজেও লাঠি লোহার রডের আঘাতে মারত্বকভাবে আহত হই। আমার হাতে পায়ে ও বুকে-পিটে মারত্বক আঘাত লাগে। এরপরও আমি কোর্ট পুলিশদের উদ্ধার করে কোর্টের ভিতর ঢুকিয়ে দেই আর ছাত্রলীগের পিও কে উদ্ধার করে সিএনজি যোগে হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালের জরুরী বিভাগে গিয়ে দেখি সাদ আল আফনান সহ ছাত্র-জনতা ও ছাত্রলীগ যুবলীগের অনেকেই জরুরী বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছে। আফনানের অবস্থা দেখে তখনি আমি ধারণা করছি যে, সে হয়তো আর বাঁচবেনা। তখন লারি বাড়ীর জনি নামে পরিচিত ছোট ভাই জরুরী বিভাগের আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে ব্যস্ত ছিল। তখন তাকে ইশারা দিয়ে বলার চেষ্টা করি আফনান এবং পিওকে যেন ভালো চিকিৎসা দেয়। কারণ তারা কে কোন দল সেটা বিবেচ্য বিষয় ছিলনা। দুই জনই মারত্বক আহত। (তবে আফনানকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে ছাত্রলীগ যুবলীগের লোকজন)। মাদাম ব্রিজ এলাকায় তখনো দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলমান। যখন হাসপাতালে দুই পক্ষের লোকজনের চিকিৎসা চলছে। আফনানকে আমি চিনিনা। তবে যারা উদ্ধার করছে তাদের ভাষ্যমতে বুজলাম সে আন্দোলরত একজন শিক্ষার্থী ছিল। তাৎক্ষনিক তার কলেজ ব্যাগ ও মোবাইল আমি নিজ দায়িত্বে রাখি। তার মাকে ফোন দিয়ে জানাই যে তার ছেলে অসুস্থ্য হয়ে হাসপতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাকে চিকিৎসা করতে আমি সহযোগিতা করি। হাসপাতালে মাকে আসতে বলি। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয় চিকিৎসকরা। পথেই সে মারা যায়। নিউজ কাভারেজের জন্য সেখান থেকে ছবি ভিডিও আমার প্রয়োজনমতে সংগ্রহ করি। এবং একপর্যায়ে হাসপাতাল ছেড়ে বের হয়ে আসি। এর আগে হাসপাতালের দ্বিতলায় একটা ছেলে কাতরাচ্ছে। সে পিঙকি প্লাজায় ১ টু ৯৯ দোকানের কর্মচারী ছিল। তাকে ছাত্রলীগ ভেবে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাকে শিক্ষার্থীরাই হাসপতালের নিয়ে আসে। মারত্বক আহত হওয়ায় সে কথা বলতে পারেনা। কোন রকম কথা শুনে বুজলাম তার বাড়ী শরীয়তপুর। এই মুহুর্তে তার সাথে কেউ নাই কে দেখবে কে সহযোগিতা করবে। পরে আমি তার নাম ঠিকানা অনুযায়ী আমার সহকর্মী শরীয়তপুর মাছরা টেলিভিশনের প্রতিনিধিকে ফোন দিয়ে জানাই। তার ঠিকানা সংগ্রহ করে পরিবারকে জানিয়ে তাকে শরীয়তপুর পাঠানোর চেষ্টা করি। দুই দিন পর এম্বুলেন্স যোগে শরীয়তপুর পাঠানো হয়। (প্রসঙ্গত- আরো বেশ কিছু ঘটান এরিমধ্যে আছে।)
এদিকে সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারি ছাত্রলীগ যুবলীগ নেতাকর্মীরা মাদাম থেকে ফিরে এসে জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি সালাহ উদ্দিন টিপুর বাস ভবনে অবস্থান করছে। এমন সংবাদের ভিত্তিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও আস্তে আস্তে বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করে বাজারের দিকে আসতে থাকে। কেউ উত্তর তেমুহনী হয়ে কেউ হ্যাপী সিনেমার সড়ক হয়ে বাজারে এগিয়ে গেছে। একপর্যায়ে নতুন করে উভয়ের মধ্যে বাঁধে সংঘর্ষ। প্রথমে ইটপাটকেল পরবর্তীতে টানা গুলিবর্ষণ। শিক্ষার্থীরাও সড়কে অবস্থান করে প্রতিরোধ প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। তিতাখাঁ মসজিদের গেইটের তালা ভেঙ্গে ছা্ত্ররা মসজিদের মাইক ব্যবহার করে বার বার ঘোষণা দিচ্ছে সাবাই এগিয়ে যাও, সামনে যাও, কেউ পিছ পা হবেনা।
আন্দোলনকারীরা ভূমি কার্যালয় ও বাজারের তমিজ মার্কেট এলাকায় আসলে প্রয়াত সাবেক মেয়র আবু তাহেরের বাসার ছাদ থেকে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান টিপুর নেতৃত্বে প্রায় আড়াই ঘন্টাব্যাপী গুলি বর্ষণ করা হয়। (যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল)। আহত হয় শত শত ছাত্র-জনতা। কিছুক্ষণ পরেই গুলির শব্দ আর অটোরিকশাযোগে একজন দুইজন তিনজন করে রক্তাক্ত অবস্থায় সহপাঠিরা নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালে। সে সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে কাউছার আহমেদ বিজয়, ওসমান গণি ও সাব্বির আহমেদ নামে তিনজন শিক্ষার্থী মারা যায়। আহতদের উদ্ধার করে রিকশা অটো করে একের পর এক করে উত্তর স্টেশন হয়ে আধুনিক হাসপাতাল, নোভা ট্রমা, মডেল হাসপাতাল সহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তখন সময় দুপুর ১টা থেকে চলে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। আমিও হাসপাতাল থেকে মিয়া বাড়ীর সড়ক দিয়ে আলিয়া কামিল মাদরাসার সামনের সড়ক হয়ে ক্লাবে অবস্থান করি। তখন নিউজ কাভারেজের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম পাবেল সহ বেশ কিছু সংখ্যক সাংবাদিক অবস্থান করি। এরমধ্যে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ে তারা। প্রথম আলো প্রতিনিধি এ বি এম রিপন ভাই একটা ছবি তুলতে গেলেই শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্দ হয়ে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে। তাদেরকে বুজানোর চেষ্টা করা হয় যে, সাংবাদিকরা তোমাদের জন্য নিউজ কাভার করছে। এদিকে গুলিবিদ্ধ হয়ে একের পর এক আসতে থাকে। শিক্ষার্থীরা বলছে আপনারা টিপু গুলি করার ছবি কেন নিচ্ছেনা। কেন আমাদের ছবি নিচ্ছেন। তাদের বুজানো হচ্ছে যে, আমাদের অন্য সহকর্মীরা সেখানে আছে। আমরা সবাই ক্লাবে হলরুমে বসে বসে কথা বলছি। কিছু বুজে উঠার আগেই ক্লাবের গ্লাস ভাঙচুর করা হয়। সে সময় আমি নিজেই পুনরায় মারত্বক আহত হই। আমার মাথায় গ্লাস ও ইটের আঘাত লাগে। এর আগে ক্লাবের বাইরে আমার পিঠে ককটেলের স্প্লেন্টার পড়ে মারত্বক আঘাত প্রাপ্ত হই। পরে ক্লাবের প্রচার সম্পাদক নাজিদ উদ্দিন রানা সহ শিক্ষার্থীদের বুজানো হলে শিক্ষার্থীরা ক্ষান্ত হওয়ার পর ক্লাবের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
আস্তে আস্তে বাজারমুখি সংঘর্ষের ঘটনাস্থলে তথা তিতাখা ও টিপুর বাসভবনের দিকে এগুতে থাকি। শাখারীপাড়া সড়কে গিয়ে দেখি তিনজনের মরদেহ। দুপুর ১ টা বাজে ৩০ মিনিট শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে নিহত হয় টুমচরের ইউপি সদস্য ও যুবলীগ নেতা হারুনুর রশিদ, তানজীদ হায়দার রিয়াজ ও আহমেদ শরীফ। সালাহ উদ্দিন টিপুর বাস ভবন থেকে নেমে পিছনের সড়ক ব্যবহার করে পালিয়ে যাবার পথে শাঁখারীপাড়া সড়কে শিক্ষার্থীদের সামনে পড়ে। সেখানেই হামলা শিকার হয়ে মারা যায় তারা। ছাত্রলীগ নেতা রাকিবুল হাসান সিফাত, প্রথমে আগুনে পুড়ে গিয়ে নিচে লাফ দিলে সেখানেই হামলা শিকার হয়, তাওহিদ কবির রাফি, ইউছুফ, এবং সুজন ছাদ থেকে নেমে আসলে তারাও হামলার শিকার হয়ে মারা যায়। সময় আনুমিানিক বিকেল ৪টা। এভাবে চলতে থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এদিকে থমথমে বিরাজ করছে পুরো লক্ষ্মীপুর জেলা। এরিমধ্যে গুলির কোন শব্দ নাই। ছাদেও কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। পরবর্তীতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা মেয়র তাহের ও টিপুর বাসভবন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। যদিও তারা ছাদে উঠে পালিয়ে থাকে। পুরো রাতভর অবস্থান নেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী সহ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে টিপুসহ তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন উদ্ধার হয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এদিকে একই দিন বিকেলে জেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক এড. নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বাস ভবন, পৌর মেয়র আওয়ামীলীগ নেতা মোজাম্মেল হায়দর মাসুম ভূ্ঁইয়ার বাস ভবনে আগুন লাগিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা। তাছাড়া রাতে সাবেক ছাত্রলীগ সেক্রেটারী রাকিব হোসেন লোটাসের বাস ভবনে আগুন দেয় তারা। পুরো লক্ষ্মীপুর শহর আন্দোলনরত শিক্ষার্থী-জনতার দখলে ছিল। দোকান-পাট বন্ধ করে ব্যবসায়ীরা অনেকেই তাদের নিরাপত্তায় বাসা-বাড়ীতে ঢুকে যায়।
পুরো দিনের সংবাদ কাভারেজ করতে গিয়ে তিনটি স্পটে আমি নিজেও আহত হই। খাওয়া নেই নাওয়া নেই। নিজেই ঠিকমতো আর দাঁড়াতে পারছিনা। তাছাড়া আমার অনেক সহকর্মী সংবাদ কাভার করতে গিয়ে বারংবার হুমকি ও খারাপ পরিস্থিতির শিকার হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুরোদিন তারা সংবাদ কাভার করেছে। এমন পরিস্থিতি দেশের তরে আর না আসুক। এমনটাই প্রত্যাশা করছি। বিঃদ্রঃ- এরপর আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে যেটি আয়ত্তে আনতে পারিনি।